মনযূরুল হকের স্মৃতিদর্পণ: ইতির কথা মনে পড়ে

 

মনযূরুল হক

ইতি নামের একটা মেয়ে ছিল আমাদের স্কুলে। মনে পড়ল কেন? ওই যে এখন সবাই চিঠি লিখছে, শেষে লিখছে ‘ইতি’। তেমন কোনও বিশেষত্ব ছিল মেয়েটার, তা নয়। আমাদের ক্লাসে এমনিতে ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড হতো ছেলেরাই। তবে মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট থাকত ইতি। ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত এমনই চলেছে।

থ্রির বছর আমাদের স্কুল মডেল স্কুলের মর্যাদা পায়। এই সময় দুজন নতুন ইয়াং শিক্ষক পেলাম আমরা-শহীদ স্যার আর মোজাম্মেল স্যার। তাদের হাত ধরে নিয়মিত পাঠ্যক্রমের সাথে নানান এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটি যুক্ত হতে থাকে। রঙ-বেরঙের বই এলো বিপুল, ছেলে-মেয়েদের আলাদা কমন রুম পেলাম, স্কাউটিং শুরু হলো ইত্যাদি। আরেকটা জিনিস হলো- মেধার বিচারে ক শাখা ও খ শাখা আলাদা করা হলো।

এই সুযোগে কয়েকটি মেয়ের সাথে আমাদের সখ্য হলো। ক্লাস টু পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে বিষয়ে কোনও চেতন ছিল না, বরং মেয়েরা কলম দিয়ে টোকাটুকি খেলা, পাঁচ গুটি, এমনকি বউ-পুতুল খেলায় না ডাকলেও বঞ্চিত লাগত। বয়স বাড়ার সূত্রে লজ্জার উদয় হয়েছে আরও পরে। তবে থ্রির বছর থেকে মেয়েরা-ছেলেরা ভাগ হয়ে খেলতাম। মেয়েদের দলকে দাড়িয়াবান্ধা বা দড়ির লাফ খেলতে চ্যালেঞ্জ দিতাম। ফোরের বছর এমন এক ম্যাচে একটা মেয়ে উল্টি খেয়ে পড়ল এবং ভীষণ লজ্জা পেল। মেয়েদের সাথে খেলায় আমাদের ইতি ঘটল তখনই।

তারপরও মেয়েরা যতটা স্বচ্ছন্দে আমাদের ডাক দিতে পারত, আমরা তা পারতাম না। যেমন, লিটার সাথে থানা মসজিদের মক্তবে ভোরে পড়তে যেতাম। ওর বাবা পুলিশ, কোয়ার্টারে থাকে ওরা। এক সকালে পাকা খেজুর কুড়িয়ে কোঁচড় ভরে নিয়ে হাঁটছিল আর একটা-দুইটা মুখে দিচ্ছিল। পথে আমাকে দেখে কাপড় বাড়িয়ে দিল, যেন আমি কয়েকটা নিই। কিন্তু আমার ওইভাবে নিতে সংকোচ হচ্ছিল। অথচ লিটা ছিল সপ্রতিভ স্বাভাবিক। পরে অবশ্য ও-ই মুঠোয় করে তুলে দেয়।

লিটার সাথে পরে হেফজখানায় থাকতে একবার দেখা হয় গৌরনদীতে, ওটাই শেষ।

আরেকটা মেয়ে ছিল মিতা। শুধু নামটা মনে আছে। স্কুলে থাকতে বন্ধুরা ভাবত, মিতার সাথে আমার ভালো খায়-খাতির। অনেক বছর পরে, হেফজ শেষ ততদিনে, ফাতেমা আপুর মেট্রিক পরীক্ষার কারণে আমরা কিছুদিনের জন্য উজিরপুরে এলাম। পুরনো বন্ধুদের নিয়ে স্কুল মাঠে আড্ডা দিচ্ছি। সোহাগ বলল, ওই মিতা যাচ্ছে, ডাক দেব? অথচ মেয়েটার মুখটা ততদিনে ভুলে গেছি।

আর মনে আছে বিচিত্রার কথা। প্রচণ্ড চঞ্চল একটা মেয়ে। গায়ের রং ময়লা, তবে লম্বাটে। এমনকি বয়সে আমাদের চেয়ে বড় বড় লাগত। একদিন স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাসের পড়া ছিল, খাদ্য কী? আমি মুখস্থ করি নাই। বিচিত্রা সাহায্য করল, সংক্ষেপে ‘ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমরা যা খাই তা-ই খাদ্য’। ‘নিবারণ‘ মানে কী, জানতাম না। বারবার বলছিলাম, ‘নিরানোর’ জন্য। বিচিত্রা হাসতে হাসতে শেষ। তার বহু বছর পরে, একদিন গার্লস স্কুলের সামনে দিয়ে চৌমাথার দিকে যাচ্ছি। আমার গায়ে লম্বা পাঞ্জাবি, পরনে লুঙ্গি, মাথায় টুপি। বিচিত্রা ঠিকই চিনল, ‘এই মোর্শেদ, দাঁড়া’ বলে ডাক দিল। আরও লম্বা হয়েছে মেয়েটা। একসাথে পড়েছি, তারপরও আমি তাকে দেখে এড়িয়ে যাচ্ছি বলে অভিযোগ করল। ক’দিন পরে দুর্গাপূজা, খুব করে নিমন্ত্রণ করল যেন অবশ্যই যাই। আমার অবশ্য সাহস হয় নাই যাওয়ার।

আবার দুয়েকটা বাজে ঘটনাও আছে। যেমন, লিটন নামের একটা ছেলে ছিল ব্যাকবেঞ্চার। ওর মা আমাদের বাসায় কাজ করতেন। তিনি কথায় কথায় অত্যাধিক বুঝাতে গিয়ে বলতেন ‘অধ্যাতিক’। ‘লিটনের মা’ নামে এলাকায় বেশ পপুলার ছিলেন তিনি। একদিন বাসার অদূরে স্কুলে যাওয়ার পথে দেখি, একটা মোটা চালতা গাছের বুক কেটে ‘লিটন+লিটা’, তারপর একটা অশ্লীল শব্দ লেখা। সবার ধারণা লিটন নিজেই লিখেছে। লাইব্রেরিতে (টিচার্স রুম) বিচার গেল এবং লিটন খুব মার খেল।

আমাদের দপ্তরির নাম কী ছিল, মনে নাই। ‘সালাম’ হতে পারে। সে মাঝেমধ্যে হাবিজাবি গল্প শোনাত। এবং খারাপ ইঙ্গিত দিয়ে বলত, তোদের নিশ্চয় এখন এমন হচ্ছে। গা ঘিনঘিন করত। আমরা প্রবল অনিচ্ছায় সেসব শুনতাম, কেননা, দপ্তরিকে হাতে রাখার একটা চেষ্টা আমাদের ছিল। তাতে হুটহাট দোকানে যাওয়া বা বড় আপা আসছেন কি না, কিংবা স্যারদের মিটিং তাই তাড়াতাড়ি ছুটি হবে কি না-এইসব আগেভাগে জানার সুবিধা পাওয়া যেত।

আরেকবার হলো কি, ‘চাঁদে মানুষ’ একটা গদ্য ছিল বাংলা বা বিজ্ঞান বইয়ে। কে যেন ইতির বইতে কলম দিয়ে দাগিয়ে চ-তে একটা এ-কার দিয়ে দিল। পরে জানতে পারলাম, কাজটা কে করেছে। এবং তাতে তার কোনও অনুশোচনা ছিল না, আমরাও ‘ভালো ছাত্র’ বলে তার কথা স্যারকে জানাইনি (যদিও লিটনের বেলায় ছাড় দেই নাই)।

মোজাম্মেল স্যার সহপাঠীদের পারস্পরিক সম্পর্কে খুব জোর দিতেন। ইতি একদিন ক্লাসে এলো না। আমাদের তিনজনকে পাঠালেন খবর নিতে। আমরা আব্বাস কিয়োরোস্তামির ‘হোয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হাউজ’র নেয়ামতজাদে চরিত্রের মতো তাকে খুঁজতে বের হলাম। ইতির বাসা আমরা কেউ চিনি না। ওই প্রথম জানলাম যে, ইতি হিন্দু। কথা খুব কম বলত। শ্যামবর্ণের গোলগাল মেধাদীপ্ত চেহারা। একটা ছোট্ট টিপ পরত। অবশ্য তখন অনেক মেয়েই টিপ পরত। আমার আপু বা খালাদেরও দেখেছি টিপের পাতা কিনতে। পরে যখন শুনলেন কপালে ‘আল্লাহ’ লেখা থাকে, তখন যুক্তি করলেন, কপালের ঠিক মধ্যখানে পরবেন না, একটু উপরে বা বাঁকিয়ে পরলে হবে।

যাই হোক, আমরা অনেক খোঁজ করে ছোট্ট একটা খালের ওপারে পানের বরজের পেছনে ইতিদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম। আমাদের বাসার পথ ধরেই আরেকটু সামনের দিকে এগুলে ওদের বাড়ি, একটা নির্জন দোচালা কাঠের ঘর। ইতির বেশ জ্বর, নাকমুখ শুকিয়ে গেছে। টিপ না থাকায় ক্যাজুয়াল ড্রেসে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। ওর আম্মা আমাদের বসতে বললেন। কিন্তু আমরা চলে এলাম। আসলে আমাদের কারও বলার কিছু ছিল না, বসে কী করব। চুপচাপ একটু সময় দাঁড়ালাম। আসার পথে সাঁকোর গোড়ায় পানের বরজের পাশে দেখি বিরাট এক বানর অবাক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে।

ইতির সাথে এভাবে যোগাযোগ বাড়ল। একসঙ্গে কোহিনুর আপার কাছে পড়তে যাওয়া, সোনার বাংলা গাওয়া, শহিদ স্যারের নলেজ ভিত্তিক রচনা পাঠ ইত্যাদি একসঙ্গে হলো।

শহিদ স্যার সে-সময় বিসিএস প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সারাদিন বয়েজ স্কুলের দোতলায় বসে বাচ্চাদের মতো কীসব পড়েন। আর আমাকে খালি বকেন যে, আমার এত বানান ভুল হয় কেন? আমি কেন ইংরেজি বুঝি না? ইতির মতো পরিশ্রম কেন আমি করি না? অথচ পরীক্ষায় আমার রেজাল্ট ভালো, ইতির চেয়ে রোল উপরে। স্যার হাসতেন। বহু বছর পরে সেই হাসির মর্ম বুঝেছি, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া আর সাবজেক্ট নলেজ থাকা এক না। আমার যখন কেবল কোরআনের দুই পারা মুখস্ত হয়, স্যার তখন বিসিএস শেষ করে এটিও এবং গৌরনদীতে পোস্টিং পেয়ে বাসায় আমাকে দেখতে যান। তার সঙ্গে আর দেখা হয় নাই, কোথায় আছেন জানি না।

ক্লাস ফাইভের বছর তিনিই খবর দিয়েছিলেন যে, আন্তঃজেলা রচনা প্রতিযোগিতা হবে। বাবু, ইতি আর আমাকে বললেন প্রস্তুতি নিতে। নিজেই প্রিলির চাপ সামলে রচনা লেখার কায়দা কানুন শেখালেন। বহু কিছু মুখস্ত করালেন। প্রতিযোগিতার নিয়ম হলো, নৈর্ব্যক্তিক কিছু প্রশ্নোত্তর এবং লটারির মাধ্যমে বাছাই করা রচনা নির্দিষ্ট সময়ে লেখা।

প্রতিযোগিতার ঠিক আগের দিন মনে হলো, আমি পারব না। স্কুলে গেলাম না। টেনশনে জ্বর আসল। পরদিন সকালে দেখি, ইতি আর বাবু আমাদের বাসার নিচে এসে ডাকছে। সব্বনাশ। আমরা তখন ফকির বাড়ি থাকি। আম্মু বললেন, আল্লাহর নাম নিয়ে যেতে। রিকশা ভাড়া দিলেন। বাধ্য হয়ে গেলাম। উপজেলা পরিষদে সেন্টার বসল। পরীক্ষা হলো। এবং মাস দুই পরে রেজাল্ট আসলো, আমি দ্বিতীয় হয়েছি। বানারীপাড়ার একটা ছেলে হয়েছে প্রথম। স্যার খুশি হলেন এবং বললেন, তিনি উত্তরপত্র মূল্যায়ন দেখেছেন, বানান ভুল কম হলে আমার প্রথম হওয়ার চান্স ছিল।

এর মধ্যে একদিন ক্লোজ এক সহপাঠী (নাম বললে চাকরি শেষ) জানাল যে, ও ইতিকে পছন্দ করে। আমি তো হতবাক, বলে কি! ইতি সুন্দরী না বটে, কালো শ্যামলা, কিন্তু আমাদের বন্ধুটি তো কৃষ্ণ কালো। ইতি কি ওকে পছন্দ করবে? তা ছাড়া ইতি হলো পড়ুয়া মেয়ে, হাতের লেখা চমৎকার, সে কি এসব পছন্দ-টছন্দ নিয়ে ভাবে! বন্ধুটি জানাল যে, ইতিও তাকে পছন্দ করে, এমনকি একদিন তার কাঁধে হাত রেখেছে। হাত রাখার জায়গাটা সে নিজের হাত দিয়ে দেখাল।

স্বভাবতই আমরা বিশ্বাস করি নাই। আজও করি না। কেননা, প্রায় ত্রিশ বছর পরেও আজও আমরা ভালো বন্ধু, সেখানে ইতির মতো আর দেখা না পাওয়া ‘অবিশ্বাস’ জায়গা পেতে পারে না।


প্রিয় পাঠক,
ফেসবুক লগইনের মাধ্যমে এখানে আপনার মতামত জানাতে পারেন। এছাড়া খানিকটা নিচে জিমেইল লগইন করে, নাম বা ইউআরএল লিখে অথবা নামহীনভাবে মতামত জানাবার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধন্যবাদান্তে,
সম্পাদক, ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ