জমাতুল ইসলাম পরাগের গ্রন্থালোচনা: গল্পযাত্রায় ‘ভ’-এর অধিষ্ঠান ও দুটি কথা

 

যাপিত জীবনের সূক্ষ্ম অনুভব, মন-অন্তর্নিহিত ভাবনা-চিন্তন ও লেখকের দর্শন যখন প্রবহমান নদীর বুকে আষাঢ়ের বান নিয়ে আসে, তখনই সৃষ্টিযন্ত্রণায় কাতর হন একজন সৃজনশীল মননের মানুষ। মননের গভীরে নিহিত থাকা সেই বোধ আর দিব্যদর্শনের প্রকাশ যে কোনো ফরম্যাটের মধ্য দিয়েই হতে পারে। হতে পারে এটা চিত্রকলায়, হতে পারে সেটা কবিতা-বাঁকে কিংবা কোনো এক আয়েশি গদ্যনির্মাণের পরতে পরতে। মোদ্দাকথা, একজন অনুভূতিপ্রবণ সৃজনশীল মানুষমাত্রই স্রষ্টা, সৃজনই তার চিন্তনচালিত ভাবের ফসল।

আমাদের দীপা বর্মণ তেমনি একজন সৃজনশীল মননের মানুষ। তাঁর ভেতরে জমতে থাকা অনুভূতি-বারুদ, জীবনের যাপিত গ্লানি-দুঃখবোধ কিংবা বলতে চাওয়া অব্যক্ত সব যন্ত্রণা অথবা স্বপ্নকথা বুনতে গিয়ে যে ফরম্যাট বেছে নিয়েছেন, তা হলো গল্প।

একজন চিত্রকর যেমন রঙ ও তুলির মিশেলে পটের বুকে প্রতি স্ট্রোকে স্ট্রোকে এঁকে দেন তাঁর ভেতরকার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভাবনা, অনুভব, দুঃখগাথা কিংবা সুখস্বপ্ন, আলোচ্য দীপা বর্মণও একই কাজ করেছেন। তবে তাঁর হাতে ছিল কি-বোর্ড আর বাহারি রঙের অযুত সব শব্দচয়ন। তিনি তার সাবলীল ও আঞ্চলিকতার প্রতিনিধিত্ব করে এমন শব্দ অথবা শব্দবন্ধের মধ্য দিয়ে এঁকেছেন তার সমসাময়িকতাকে। আমাদের সামনে প্রকাশিত করেছেন— তাঁর চোখ দিয়ে দেখা একান্ত ভুবনের স্পষ্টতর এক পৃথিবীকে।

সেই পৃথিবীর কিছু ছবিই আমরা দেখতে পাবো, তাঁর প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ভ’-এর পাঠশেষে। সংকলিত চৌদ্দটি গল্পের সবকটিই যে জীবনের গভীরতর রূপ-রস-গন্ধকে সমানভাবে ধারণ করতে পেরেছে, তা নয়। তবু কিছু কিছু গল্প এমনভাবে পাঠকমনকে নাড়া দেবে, যা থেকে বোঝা যাবে যে- সত্যিই তিনি আর অন্তর্দৃষ্টিকে ভালো করেই ব্যাপৃত করতে পেরেছেন চারদিককার সমাজবাস্তবতায়।

প্রান্তিক কিংবা মধ্যবিত্ত; এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতেও নারীকে এখনো অনেক বেশি vulnerable ভাবা হয়, পিতৃতান্ত্রিকতা-নিয়ন্ত্রিত সভ্যতার দীর্ঘদিনের যে রেওয়াজ, সেই রেওয়াজে এখনো যে-কোনো নেতিবাচক ঘটনার দায়ভার সহজেই মেয়েদের ঘাড়ে চাপানো হয়। এমনকি বাড়ির আর্থিক অবস্থার উন্নতি-অবনতির পেছনেও নারীকেই দায়ী করা হয়।

এরই প্রতিফলন ঘটেছে বইটির প্রথম গল্পে। গল্পটির শিরোনাম “পঞ্চাশ টাকা”। গল্পের প্রধান চরিত্র আলো একটা প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়ের প্রতিনিধিত্ব করে। যার হাতে অনেকদিন পর পঞ্চাশ টাকা আসে। সেই পঞ্চাশ টাকার নোট হাতে নেওয়ার পর অনেকদিন আগের এক তিক্ততাপূর্ণ স্মৃতি পেয়ে বসে তার মনে। মনে পড়ে, বাড়িভর্তি মেহমানের সামনে তার ননদ ও স্বামী কীভাবে পঞ্চাশ টাকা চুরির মিথ্যে অপবাদ দিয়েছিল। আচমকা এমন মিথ্যে অপবাদ পাওয়ার পর আলো থমকে গিয়েছিল, ধরিত্রীর সাথে মিশে যেতে চেয়েছিল। তবু বলতে পারেনি যে, “আমি চুরি করিনি।”

মোক্ষদা এমনই আরেক অপবাদের গল্প। গল্পচরিত্রের নামকরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘মোক্ষদা’ শব্দটি পড়লে বা শুনলে যে কারোরই মনে হতে পারে নামটি কোনো পুরুষচরিত্রের। অথচ তা এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নারীর! সেজন্য চরিত্র-নির্মাণের সাথে সাথে নামকরণের বেলাতেও লেখকদের যথেষ্ট সতর্ক হওয়া উচিত।

যা হোক, গল্পে ফেরা যাক। মোক্ষদা এমন এক স্বামীহারা চরিত্র, যার তিন কূলে কেউ নেই। যুদ্ধের সময় মোক্ষদার স্বামী কৃষ্ণকে পাকসেনারা হত্যা করে। নানান দুর্বিপাকের ভেতরেই একদিন মোক্ষদার জীবনে প্রেম আসে। মোক্ষদার গর্ভে প্রেমলালিত সন্তান এলে পুরুষটি পালিয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই সেই কলঙ্কতিলক এককভাবে মোক্ষদার ওপর লেপিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মোক্ষদার এই ঘটনার চাউর হয় নারীদের দ্বারাই। এখানে একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এখনো সমাজে নারীরাই নারীদের শত্রু! এখনো এক নারী আরেক নারীর মুখোমুখি। আর পুরুষদের নারীবৈরিতা তো প্রাগৈতিহাসিক!

তদুপরি পালিয়ে যাওয়া প্রেমিকের পরিবার সমাজকে হাত করে ফেলে। সঙ্গত কারণেই, পুরুষশাসিত সমাজ-পরম্পরা মোক্ষদার ওপর একচেটিয়াভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। উপায়ন্তর না দেখে মোক্ষদা তখন সরব হয়। তেজস্বী কণ্ঠে সে সেই পরম্পরা ভাঙতে সচেষ্ট হয়। আর তখনই সে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে, “পাপ আমি একলা করি নাই।”

একই ধারাবাহিকতা পাই ‘অলক্ষ্মী’ গল্পে। এই গল্পেরও প্রধান চরিত্র ময়না নামের এক গ্রামীণ বধূ। যার বিয়ের বয়স মাত্র ছয়মাস। বিয়ের ছয়মাসের মধ্যেই কেন ময়নার শ্বশুরের সংসারে প্রভূত উন্নতি হয়নি, তা নিয়ে শাশুড়ির বিস্তর অভিযোগ। শাশুড়ির ভাষ্যমতে, ময়নাই যেন সমস্ত আয়-উন্নতির ট্রাম্পকার্ড! কাঙ্ক্ষিত সেই আয়-উন্নতির দেখা না পেয়ে শাশুড়ি তাই ময়নাকে “অলক্ষ্মী” বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। আগের গল্পের মোক্ষদার মতো এখানেও নারী হয়ে ওঠে প্রতিবাদী, দ্রোহী। আমরা দেখতে পাই, ময়না শাশুড়ির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। শাশুড়ির চোখে চোখ রেখে পাল্টা প্রশ্ন ছোঁড়ে, “আপনিও তো এ সংসারে অনেকদিন হলো এসেছেন। আপনার সংসারের আয়-উন্নতি কই?”

এই থিমে লেখা গল্পগুলোর বিন্যাসে এক ধরনের চমৎকার জাগরণ আছে। অর্থাৎ গল্পবইয়ের শুরুর দিক থেকে যতই শেষের দিকে যাওয়া যায়, ততই নারী চরিত্রগুলো বলিষ্ঠ হতে থাকে। লেখকের এই সচেতনতা লক্ষ্যণীয়!

গল্পগ্রন্থ ‘ভ’ থেকে পাঠ করলে আরও কিছু গল্প পাওয়া, যা মানবিকতাবোধের দিকটাকে আলোকপাত করে। যেমন ‘দায়’, ‘ওয়ালা’, ‘হেমন্তের চিঠি’ ও ‘কুয়াশা-রাত: কুকুর ও পুরুষ’ প্রভৃতি গল্পে মানুষের প্রতি মানবিকতাবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় পাওয়া যায়। গল্পকার এসব গল্পের মধ্য দিয়ে কখনো স্বামী-সন্তানের প্রতি একজন নারীর দায়বদ্ধতা, একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের কথা তুলে এনেছেন অত্যন্ত দরদ দিয়ে। তুলে এনেছেন করোনাকালের কথাও। করোনাপরিস্থিতির শিকার হয়ে কী করে রাস্তায় নেমে পড়ে এক বালক! জীবন সংস্থাপনে সে কী করে আনাড়ি-অনভ্যস্ততায় হেঁকে ওঠে, “অ্যাই, আনাজ রাখবেন? আনাজ?”

শিল্প-সাহিত্য যেহেতু জীবনের কথা বলে, মানুষের কথা বলে, সেহেতু সেখানে নর-নারীর প্রেম থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। গল্পগ্রন্থ ‘ভ’ সেই স্বাভাবিকতাকেও অস্বীকার করেনি। গল্পকার সযত্নে ছুঁয়ে গেছেন নর-নারীর হৃদয়ঘটিত সম্পর্ককে। কখনো প্লেটোনিকতায়, কখনো ফ্রয়েডে; তিনি বলে গেছেন প্রেমের গল্প, কামের গল্প। বিরহে-মিলনে প্রেমও ছিল এই গল্পবইয়ের গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গ। সেই রকম প্রেমের স্পর্শ পাই “চাঁদ জোছনার জল”, “কাগজের বউ” ইত্যাদি গল্পে। উল্লিখিত গল্প দুটি সেই দিক থেকে অনেক শক্তিশালী। যেখানে দুটো মানুষের হৃদয়জাত অনুভূতি, ভালোলাগা, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ইত্যাদিকে তুলে ধরেছে বেশ সূক্ষ্মভাবেই।

ভাষার বাহন হচ্ছে সাহিত্য। গান-কবিতা, গল্প-উপন্যাস প্রভৃতির ওপর ভর করেই ভাষা তার গতি পায়। ভাষার সৌন্দর্যবর্ধন ও সৌকর্যবহনে সাহিত্যের যেমন আছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান, তেমনি সাহিত্যিকদের আছে প্রকট রকমের দায়বদ্ধতা। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সাহিত্যিকদের ভূমিকা ভাষাবিজ্ঞানীর চেয়ে অনেক উপরে, ভাষা-শিক্ষকের চেয়ে আরও গভীরে। কারণ, ভাষাবিজ্ঞানী ভাষার বিজ্ঞান তৈরি করে। আর সাহিত্যিক সেই বিজ্ঞানের জ্ঞান দিয়ে বানায় ভাষার সব নতুন নতুন প্রযুক্তি। তাই অনেকের মতে, সাহিত্যিকদের ভাষাজ্ঞান, শব্দচয়ন হতে হবে অত্যন্ত মাপা ও সুপরিকল্পিত। মানে, কোনো একটা লেখায় প্রতিটি শব্দ যেন লেখার অলঙ্কার হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে অনুভূতি প্রকাশের চূড়ান্ত মাধ্যম!

দুঃখজনক হলেও সত্যি, শব্দের শরীর নির্মাণে, বাক্যের কাঠামো তৈরিতে লেখককে এতটা সচেষ্ট মনে হয়নি। সেই জায়গায় লেখকের আরও যত্নশীল হওয়া উচিত বলে মনে করি। কিছু কিছু চমৎকার গল্পও অঙ্গহানির দোষে দুষ্ট হয়েছে শুধু সময়-স্থান-চরিত্রের যে ঐক্য আছে, তার অনৈক্যের ফলে। এক্ষেত্রে পঠন-পাঠনে, স্বরচিত লেখার কর্তন-মার্জনে গল্পকারকে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়াকে আমি ধৃষ্টতা মনে করছি না। বরং একে পাঠকের অধিকার বলেই দাবি করছি। লেখক-পাঠকের এই অধিকার আর দায়বোধ না থাকলে সাহিত্যসমৃদ্ধির ভারসাম্য নষ্ট হবে বলেই মনে করি।

ছাপাখানার ভূত তাড়িয়ে, কিছু গল্পের পরিমার্জন করে নিলে গল্পবই ‘ভ’ হতে পারে চমৎকার একটি প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্যসম্পদ। যেমন “অখ্যাত খ্যাতিনামা” গল্পটির নামে যে চটুল ও পলকা একটা আঁচ আছে, সেই গল্পটির শিরোনামই যদি ‘চরিত্রনামা’ হতো, তাহলে তা অন্য একটি মাত্রা পেতে পারতো। একইভাবে “হেমন্তের চিঠি”র মতো গল্পে যদি সমসাময়িকতার ব্যাপারে গল্পকার সচেষ্ট থাকতেন, তাহলে তা একটা দারুণ লেখা হতো। এই গল্পের চরিত্রকে একটি টেলিফোন বুথের সামনে অপেক্ষমাণ থাকতে দেখা যায়। অথচ গল্প শেষ হয় একই চরিত্রের মুঠোফোনের রিংটোনে। যেখানে হাতের কাছে মুঠোফোন অ্যাভেইলএইবল, সেখানে ল্যান্ডফোনের বুথের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার প্রাসঙ্গিকতা কী— তা বুঝিনি! এরকম আরও অনেক ছোটখাটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি, ভুলত্রুটি মাড়িয়ে যেতে পারলে বইটির যে খুঁত আছে, তাও থাকত না।

হাস্যরসের অবতারণা করতে গিয়ে গল্পকারকে রম্যলেখার আশ্রয় নিতে হয়েছে। অথচ তিনি তার সিরিয়াস গল্পগুলোতে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে যে হিউমার উপস্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। “হেমন্তের চিঠি” গল্পের কিছু কিছু জায়গায় যে রসবোধ ও নিত্যজীবনের উইট পাওয়া গেছে, তা লেখকের মুনশিয়ানারই প্রকাশ।

এই গ্রন্থের পাঠ শেষে পাঠকদের মনে লেগে থাকবে, “চামেলি” গল্পের বৃহন্নলা চামেলির দ্রোহী প্রতিবাদের কথা! সত্যিই সে হিজড়া না কি ভণ্ড প্রতারক, সেই প্রশ্নের উত্তরে সে নিজেকে যেভাবে দিগম্বর করে প্রশ্নকর্তার সামনে দাঁড়ায়, তা যেন সমাজের সভ্যদের ভণ্ডামিকেই দিগম্বর করে! একই সুর ও স্বরের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় নাম-গল্প ‘ভ’-তেও। সেখানেও গুরু-শিষ্যের প্রগলভ ভণ্ডামির একটা বারতা পাওয়া যায়।

গল্পকার হিসেবে দীপা বর্মণের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের মোড়কীয় মাধ্যম, ‘ভ’-এর প্রচ্ছদ করেছেন হিমেল হক, বইটি প্রকাশ করেছে মনন প্রকাশ। আমি এই গল্পবইয়ের সমূহ সাফল্য ও প্রচারণা এবং গল্পকারের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা জানাচ্ছি।

প্রিয় পাঠক,
ফেসবুক লগইনের মাধ্যমে এখানে আপনার মতামত জানাতে পারেন। এছাড়া খানিকটা নিচে জিমেইল লগইন করে, নাম বা ইউআরএল লিখে অথবা নামহীনভাবে মতামত জানাবার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধন্যবাদান্তে,
সম্পাদক, ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ