সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রেম; কলকাতা ও দুজন অনুক্ত নারী

 

জমাতুল ইসলাম পরাগ


সুকান্ত ভট্টাচার্য নামটি উচ্চারণ করলে মনের মধ্যে সবার আগে যে চিত্রকল্পটি তৈরি হয়, তা হলো স্বাধীনতাকামী ব্রিটিশ-রাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথাবলা মার্কসবাদী এক সনাতন নজরুল! অথচ এই কবিকে আমরা খুব নরম স্বরে ডাকি “কিশোর কবি” বলে। 


পাঠ্যবইয়ে, পত্রিকার পাতায়, সাহিত্যসভায়— সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম উচ্চারিত হলেই আমরা আওড়াই “এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান...” অথবা আওড়াই “লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ/অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।”


এ সমস্ত কবিতা বা কবিতা-লাইন যখন শুনি বা পড়ি, তখন আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগতো— একুশ বছর বয়স নিয়ে চলে যাওয়া কিশোর কবি এত এত বিদ্রোহী কবিতাই কি লিখেছেন শুধু? তার লেখায় কি প্রেম নেই? নারী নেই? নর-নারীর মধ্যকার আদি-সম্পর্কের কোনো বীজ কি সুকান্তের মনে কোনোদিন রোপিত হয়নি?


তখনই পড়তে শুরু করি, সুকান্ত ভট্টাচার্যের পত্রগুচ্ছ। কবি সুকান্তের জীবনে যে বন্ধুটি খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, তিনি অরুণাচল বসু। শৈশবের সহপাঠী, বন্ধু, সাহিত্য-সারথী। বিশেষত এই কবি-বন্ধুটি হয়ে ওঠেছিলেন কবির হৃদয়ের নরম-কোমল সমস্ত অনুভব রাখার বিশ্বস্ত আধার।


পত্রগুচ্ছের প্রথম পত্রটিতে কবি সুকান্তের প্রথম প্রেমের কথা আমরা জানতে পারি এইভাবে—

“কলকাতাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, একটা রহস্যময় নারীর মতো, ভালোবেসেছিলাম প্রিয়ার মতো, মায়ের মতো।.... তার স্পর্শে আমি জেগেছি, তার স্পর্শে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। বাইরের পৃথিবীকে আমি জানি না, চিনি না, আমার পৃথিবী আমার কলকাতার মধ্যেই সম্পূর্ণ।” 


জন্মভূমি ও বেড়ে ওঠার স্থানটির প্রতি সব মানুষের প্রবল রকমের দুর্বলতা থাকে, আমরা জানি। সুকান্তের জন্ম যেহেতু কলকাতায়, তাই কলকাতার প্রতি এমন প্রীতি ও দুর্নিবার আকর্ষণ থাকবে— এটাই ভাবিত। তা সত্ত্বেও এই আলাপে সুকান্তের জন্মস্থানপ্রীতিকে এমন করে সামনে আনার হেতু কী? 


হেতু একটাই। সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম শুনলেই প্রায় সকল সাহিত্য-সমঝদার উচ্চারণ করেন মার্কসধারার বামপন্থী কবি সুকান্ত; যার কবিতা কেবল স্বাধীনতার জন্যে, সাম্যের জন্যে, মুক্তির জন্যে। কিন্তু না। ১৯৪২ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যখন গুঞ্জন উঠলো, জাপানিরা বোমা মেরে কলকাতা শহরকে উড়িয়ে দেবে, ধ্বংস করে দেবে, তখন শঙ্কায় ও শোকে দ্রোহী মন প্রবল জন্মভূমিকাতর হয়ে পড়ল। তিনি তার বন্ধুকে লিখলেন, “... ম্লানায়মান কলকাতার ক্রমন্তস্বমান স্পন্দনধ্বনি শুধু বারংবার আগমনী ঘোষণা করছে আর মাঝে-মাঝে আসন্ন শোকের ভয়ে ব্যথিত জননীর মতো সাইরেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। নগরীর বুঝি অকল্যাণ হবে? সম্মুখে মৃত্যুকে দেখে, ধ্বংস দেখে—কখন কলকাতার অদূরে জাপানি বিমান দেখে আর্তনাদ করে উঠবে?”


তিনি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছেন, “আমার জন্ম-পরিচিত কলকাতা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাবে অপরিচয়ের গর্ভে, ধ্বংসের সমুদ্রে, তুমি কি তা বিশ্বাস করো, অরুণ?”


ততদিনে তার বন্ধু অরুণ তথা অরুণাচল বসু কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন পূর্ববাংলায়, যশোরে। কলকাতার যেসব অনুষঙ্গ সুকান্তর বড্ড প্রিয় ছিল, তার মধ্যে অন্যতম প্রিয় স্থান ছিল অরুণাচল বসুর বাড়িটি। খুব অল্প বয়সে মাতৃহারা হওয়ার পর যে রাণীদির আশ্রয়ে মানুষ হচ্ছিলেন শিশু সুকান্ত, তিনিও একদিন ওপাড়ে পাড়ি জমান। ফলে সুকান্তর মাতৃস্নেহ ও মাতৃসান্নিধ্য পাওয়ার ব্যাকুলতা তীব্র ছিল। বন্ধু-মাতা সরলা বসুর প্রতি সেই তীব্র টানকে আমরা দেখতে পাই কবির ব্যক্তিগত পত্রালাপে। অরুণাচল বসুরা যখন কলকাতার বাড়িটি ছেড়ে চলে আসেন এই বাংলায়, তখন যে বেদনা বুদবুদ তৈরি হয়েছিল কবির মনে, তাও ব্যক্ত করেছেন তার লেখা চিঠিতে। কবি লিখেন, “তোদের আগের সেই লতাচ্ছাদিত, তৃণশ্যামল, সুন্দর বাড়িটি ত্যাগ করা হয়েছে। যেখানে তোরা ছিল গত বছর নিরবচ্ছিন্ন নীরবতায়, যেখানে কেটেছে তোদের কত বর্ষণমুখর সন্ধ্যা, কত বিরস দুপুর, কত উজ্জ্বল প্রভাত, কত চৈতালি হাওয়ায় রোমাঞ্চিত রাত্রি, তোর কত উষ্ণ কল্পনায়, নিবিড় পদক্ষেপে বিজড়িত সেই বাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হলো আপাত নিষ্প্রয়োজনীয়তায়।” 


কবি আরও লিখেন, “শত শত জন-কোলাহল-মথিত ইস্কুল বাড়িটি আজ নিস্তব্ধ নিঝুম। সদ্য বিধবা নারীর মতো অবস্থা। তোদের অজস্র স্মৃতিচিহ্নিত তার প্রতিটি প্রত্যঙ্গ যেন তোদেরই স্পর্শের জন্য উন্মুখ; সেখানে এখনও বাতাসে পাওয়া যায় তোদের স্মৃতির সৌরভ। কিন্তু সে আর কতদিন? তবু বাড়িটি যেন তোদেরই ধ্যান করছে।” 


এই ধ্যান, এই শোক এবং স্মৃতিকাতরতা যে সেরেফ বাড়িটির নয়, মূলতা কবিরই চারণভূমি হারানোর শোক ও স্মৃতিমেদুরতা; তা আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকে না। এভাবেই কবি সুকান্ত বারবার নানাভাবে নানা ঘটনায় কলকাতাকে তুলে এনেছেন নিজের মায়ের মতো, প্রেমিকার মতো, সহোদরার মতো। 


যা হোক, এবার আসা যাক সেই উপক্রমণিকার উপক্রমনিকায়।

উপক্রমণিকা শব্দটি মূলত একটি ছদ্মনাম। যে মেয়েটিকে আমরা কবির প্রথম প্রেম হিসেবে দেখতে পাই। বন্ধু অরুণাচলকে লেখা চিঠির মাধ্যমেই আমরা জানতে পরি সেই মেয়েটির কথা। যার জন্য সুকান্ত লিখেছিলেন, “... উপক্রমণিকা ভরিয়ে তুলল আমাকে তার তীব্র শারীরিকতায়— তার বিদ্যুৎময় ক্ষণিক দেহব্যঞ্জনায়, আমি যেন যেতে-যেতে থমকে দাঁড়ালাম, স্তব্ধতায় স্পন্দিত হতে লাগলাম প্রতিদিন। দৃষ্টি দিয়ে পেতে চাইলাম তাকে নিবিড় নৈকট্যে। মনে হলো— আমি যেন সম্পূর্ণ হলাম তার গভীরতায়। তার দেহের প্রতিটি ইঙ্গিত কথা কয়ে উঠতে লাগল আমার প্রতীক্ষমাণ মনে। আমার স্বাভাবিকতায়।” 


কবির নানান পত্রালাপে আমরা দেখতে পাই যে, এই উপক্রমণিকা কবির প্রতিবেশী। যার সাথে তার প্রায়ই দেখা হতো, গভীর তৃষ্ণা নিয়ে তাকে দেখতেন কবি। বহুদর্শনেও সেই তৃষ্ণা নিবারিত হতো না। তাই তো তিনি লেখেন— “ওকে দেখবার তৃষ্ণায় আমি অস্থির হয়ে উঠতে লাগলাম বহুদর্শনেও। না-দেখার ভান করতাম ওকে দেখার সময়।”


ছদ্মনামে উল্লিখিত সেই মেয়েটির প্রেমে পড়ার মধ্য দিয়েই মূলত কবি সুকান্ত শিশু সুকান্তের পাঠ চুকিয়ে পৌঁছে যান প্রেমিক সুকান্তে। তার ভেতরকার পৌরুষবীজটি মূলত তাকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই রোপিত হয়। সেই কথাও বন্ধু অরুণকে অকপট লেখেন। 


খুব বেশিদিন সেই প্রেম রইল না কবিমনে। কারণ বোধকরি উপক্রমণিকার অরুণের মতো কলকাতা ত্যাগ করা। তার বিদায়কে কবি বর্ণনা করেন এভাবে— “ওর চলে যাওয়ার দিন দেখেছিলাম ওর চোখ, সে চোখে যেন লেখা ছিল, “হে বন্ধু, বিদায়, তোমাকে আমার সান্নিধ্য দিতে পারলাম না, ক্ষমা করো।” 


উপক্রমণিকার এই  চলে যাওয়া কবিকে সন্দেহাতীতভাবে বিহ্বল করেছিল। তার বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন এভাবে, “সে কয়েকদিন কেটেছিল এক মূর্ছনার মধ্য দিয়ে, সমস্ত চেতনা হারিয়ে গেছিল কোনো অপরিচিত সুরালোকে।” 


হারিয়ে যাওয়া চেতনা ফের জাগ্রত হতেও খুব একটা সময় লাগেনি। চলে যাওয়া উপক্রমণিকার শোক ও শূন্যতা খুব দ্রুতই যে কেটেছিল, সেটাও আমরা জানতে পাই কবিতার মতন পত্রপুষ্পরাজিতে। ফলে আমরা উপক্রমণিকার ব্যাপারে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, এটি কবির যতটা না ভালোবাসা ছিল, তারচেয়ে বেশি ছিল ভালোলাগা। এক ধরনের মোহ, ইনফ্যাচুয়েশন।


যা হোক, এখন আমরা মহিমান্বিত নারীটির কথা বলতে যাচ্ছি, সে-ই ছিল মূলত কবির আসল প্রেম। আগের প্রেমে আমরা প্রেমিকার শারীরিক বর্ণনাই দেখি। অথচ এখন যাকে নিয়ে আমরা আলোচনা করতে যাচ্ছি, তার সাথে তার শরীরী উপস্থিতি ছিল ঢের বেশি ও নিবিড়। তবুও তার প্রতি কবির শারীরিক টান এতটা প্রকট ছিল না, যতটা ছিল হার্দিক ও প্লেটোনিক। 


কবিকে বাকি জীবন আমরা তারই গুণগান গাইতে দেখব। তার প্রেমে বুঁদ হয়েই থাকতে দেখব। অথচ সেই প্রেমের ঘটনাকেই কবি নিজের কাছে, প্রাণপ্রিয় বন্ধুর কাছে লুকাতে চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি বন্ধু অরুণকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, “আমার প্রাণের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ যে, তোর কাছেও তো গোপন রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আবেগের বেগে সংযমের কঠিনতা গলে তা পানীয়রূপে প্রস্তুত হলো।” 


প্রেমবিষয়ক কোনো প্রসঙ্গ এলেই এরপর থেকে সেই প্রেমিকার কথা বারংবার বলে গেছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তিনি সেই প্রেমকে এমনভাবে ঢাকতে চেয়েছিলেন যে, কোথাও কখনো অর্ধনাম, ছদ্মনাম এমনকি নামের আদ্যাক্ষর অবধি লেখেননি। সবসময় এলিপসিস্ বা ড্যাশ্ দিয়ে আড়াল করেছেন।


আমাদের আলোচনার সুবিধার্থে আমি তার একটি নাম দিলাম যবনিকা। পরেরবার যতবারই ওই প্রেমিকার প্রসঙ্গ আসবে আমরা সেই নাম গোপনকরা মেয়েটিকা যবনিকা বলে সম্বোধন করব।


যবনিকার প্রতি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সম্পর্কটি এত গুরুত্বের ও মহিমার ছিল যে, তিনি সেই প্রেমকে মিলনে রূপ দিয়ে মলিন করতে চাননি। যার দরুণ এক নিবিড় সাক্ষাতে তিনি যবনিকাকে বলেছিলেন, “একটা কথা বলব? প্রথমবার শুনতে পেল না। দ্বিতীয়বার বলতেই মৃদু হেসে ওঠে ঔদ্ধত্যভরে। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। বললাম, “কিছুদিন আগে আমার একখানা চিঠি পেয়েছিলে? ভ্রূকুটি হেনে ও বলল, কলকাতায়? আমি বললুম, না বেনারসে। ও মাথা নেড়ে প্রাপ্তিসংবাদ জ্ঞাপন করলে। আবার একটু দম নিয়ে বললাম, অত্যন্ত অসতর্ক অবস্থায়, আবেগের মাথায় পাগলামি করে ফেলেছিলাম। সেজন্য আমি এখন অনুতপ্ত এবং এইজন্যে আমি ক্ষমা চাইছি।” 


খাঁটি প্রেম পূর্ণতা পায় না খুব বেশি। এর কারণ বোধহয় এটা যে, সত্যিকারের প্রেমগুলো এমনই মানুষের সাথে হয়ে থাকে, যাদের সাথে পরিণয়ের মতো সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সামাজিকতাটাই নষ্ট হয়। আলোচ্য যবনিকাও ছিল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের তেমনই স্বজন ও সুজন, যার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের হিমালয় চূড়া স্পর্শ করা যায় অনায়াসে, অথচ সামাজিক সম্পর্কের সোপানের প্রথম ধাপেও পা রাখা যায় না। তাই তো তিনি এক চিঠিতে যবনিকা সম্পর্কে লেখেন— “যদি আত্মীয়রা জানতে পারে একথা (যবনিকার প্রতি প্রেম সম্পর্কে), তবে আমার লাঞ্চনার অবধি থাকবে না। কোনো একজন বিশেষ ব্যক্তির নাম গোপন করে আরও লেখেন, “আমার বিশ্বাসঘাতকতায় (ওই ব্যক্তিটি) নিশ্চয়ই আমার সংস্পর্শ ত্যাগ করবে।” 


অথচ সুকান্ত ভট্টাচার্য তাকে পেয়ে আসছে সেই নিষ্কাম-নির্মোহ শৈশব থেকে। 

সেই যবনিকার সাথে তার সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল অত্যন্ত পারিবারিক আবহে, সহোদরার মতো। এ বিষয়ে অরুণাচল বসুকে সুকান্ত ভট্টাচার্য লেখেন, “(যবনিকাকে) তুই চিনিস। সে উপক্রমণিকারই অন্তরঙ্গ বন্ধু। সর্বোপরি সে আমার আবাল্যের সঙ্গিনী, সঙ্গিনী ঠিক নয়, বান্ধবী। যখন আমরা পরস্পরের সমুখে উলঙ্গ হতে দ্বিধা বোধ করতাম না, সেই সুদূর শৈশব হতে সে আমার সাথী।” 


বুঝতেই পারছি আমরা, যবনিকার প্রতি কবির সম্পর্কটা ঠিক সহোদরার মতই। এমনকি সুকান্তের কোনো বোন না থাকায় তার কাছ ভাইফোঁটা পর্যন্ত নিয়েছিলেন কবি। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কখন থেকে তার এই ট্রানজিশন? একথা তিনি নিজেই ব্যক্ত করেছেন এভাবে, “শেষে একদিন যখন সবে এসে দাঁড়িয়েছি যৌবনের সিংহদ্বারে, এমনি একদিন, পাশপাশি শুয়েছিলাম, ঘুমিয়ে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি ভোর হচ্ছে আর সেই ভোরের আলোয় দেখলাম পার্শ্ববর্তিনীর মুখ। সেই নবপ্রভাতের পাণ্ডুর আলোয় মুখখানি অনির্বচনীয়, অপূর্ব সুন্দর মনে হলো। কেঁপে উঠল বুক, যৌবনের পদধ্বনিতে।” 


সেই থেকেই সুকান্ত ভট্টাচার্য যবনিকাকে আস্তে আস্তে ভালোবাসতে শুরু করেন। যবনিকাকে ভালোবাসার পর উপক্রমণিকাকেও অনায়াসে ভুলে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন একই চিঠিতে। 


এই ভালোবাসায় তার দোলাচলের কমতি ছিল না। তার সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে তিনি জানতে চাইতেন, “আমার প্রধান সমস্যা, আমি আজও জানি না ও আমায় ভালোবাসে কি না। কতদিন আমি ভেবেছি, ওর কাছে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করব, এই কথার উত্তর চাইব; কিন্তু সাহস হয়নি। একদিন এগিয়েও ছিলাম, কিন্তু ওর শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমার কথা বলবার শক্তি হারিয়ে গেছিল, অসাড়তা লাভ করেছিল চেতনা।”


এভাবেই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বিপ্লবী কবিতার আড়ালে একজন প্রেমিক হিসেবে নিভৃতে প্রস্ফুটিত হয়েছিলেন বন্ধুর প্রতি লেখায় প্রতিটি চিঠির হরফে হরফে। আমরা সাধারণ পাঠকেরা কেবল তার বিপ্লব-আভাসের কবিতায় শুধু তাকে বিদ্রোহ, প্রতিবাদ আর সাম্যের জয়গানই গাইতে দেখেছি। আমাদের দেখা হয়নি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার হৃদয়ে জন্মনগরী কলকাতাকে কতটা ভালোবাসতেন। কতটা ভালোবাসতেন তার দিদি, ভাবীকে। কতটা ভালোবাসা ও সম্মানে আপন করে নিয়েছিলেন বন্ধুমাতা সরলা বসুকে।


সত্যি সত্যিই জাপানিরা যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলকাতার উপর বোমা ফেলেছিল, তখন কাগজের দুর্মূল্য হওয়া সত্ত্বেও বন্ধু অরুণকে লিখেছেন পাতার পর পাতা। সেসব পাতা কলমের আঁচড়ে বিক্ষত হতো শুধু বোমায় আক্রান্ত বিক্ষত কলকাতার বর্ণনা দিতে দিতেই। জীবনের সবটা সময় কবি সুকান্ত কলকাতাকে সযতনে বুকে ধারণ করেছিলেন। আগলে রেখেছিলেন রাঁচি, বেনারস ভ্রমণের সময়েও।

একইভাবে নাম না-জানানো প্রেমিকাটিকেও সামাজিক আগল না-ভেঙে বরং হৃদয়ের মণিকোঠায় রেখে দিয়েছিলেন জীবনভর। সেই সুকান্তের প্রেম ও প্রেমিকার কথা পড়তে গেলে বিস্ময় শুধু ও নয়; হৃদয় হয়ে ওঠে নিদারুণ শূন্যতার ও হাহাকারময়।

প্রিয় পাঠক,
ফেসবুক লগইনের মাধ্যমে এখানে আপনার মতামত জানাতে পারেন। এছাড়া খানিকটা নিচে জিমেইল লগইন করে, নাম বা ইউআরএল লিখে অথবা নামহীনভাবে মতামত জানাবার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধন্যবাদান্তে,
সম্পাদক, ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ