যাহিদ সুৃবহানের ছোটগল্প ‘অদৃষ্ট যাত্রা’

যাহিদ সুবহান

আজকের সূর্যোদয়ের ভঙ্গিমাটা একটু অন্যরকম। এত তাড়াহুড়ো, তারপরও যেন পেরে উঠছি না। সময় বেচারা স্বভাবের চেয়ে আজ একটু বেশিই শত্রুতা করছে আমার সাথে। সেই ভোরবেলা ঘুমরাজের সাথে যুদ্ধ করে বিছানাকে বিদায় জানালাম। তবু মনে হচ্ছে কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসটি ধরতে পারবো না। সময় আজ দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছে আমাকে হারানোর জন্য। আমি যদি ক্লাস ধরতে না পারি সেটাই হবে সময় নামের এই বুনো বাঁদরটার জয়। আর তার এ চেষ্টা যদি সফল হয় তাহলে সে দাঁত কেলিয়ে হাসবে। পৃথিবীর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝবো। এমন অনেকবার হয়েছে। তাই আমিও যেন একই যুদ্ধে লিপ্ত। সময়ের সাথে হারার পর তার দাঁত কেলানো হাসি হয়তো সহ্য হবে কিন্তু ক্লাস ধরতে না পারলে যে ক্ষতি হবে তা পোষানো কোনোভাবেই সম্ভব হয়ে উঠবে না। এমনিতে বরাবরই লাস্ট বেঞ্চের ছাত্র আমি। তাই তাড়াহুড়ো করে সামান্য কিছু খেয়ে পেটপুঁজো; অতঃপর হাতে বই, ফাইল ইত্যাদি নিয়ে বিদ্যাপীঠের উদ্দেশ্যে গমনের চেষ্টা। বাড়ি ছেড়ে গ্রামের রাস্তার বড় মোড়টাতে এসে দাঁড়াতেই সামনে দাঁড়িয়ে পথরোধ করলো এক অল্পবয়সী ভিক্ষুক মহিলা। কোলে তার এক বছরের এক ছেলে। স্বভাব ভিক্ষুকের মতই এক হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আর স্বাভাবিক ভিক্ষুকদের মতই তার বাচনভঙ্গি, ‘ভাত খামু, একটা টেহা দেন।’
ভিক্ষুক যে প্রতিদিন চোখে পড়ে না তা নয়। তবে আজকের এই অল্পবয়সী ভিক্ষুকের মধ্যে কী যেন কী আছে। অনেক রহস্যময়তার ঘ্রাণ পেলাম যেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে আসলে সে কোন পেশাদার ভিক্ষুক নয়। তার চোখগুলো কী যেন বলছে! তার শরীরের শীর্ণ পোশাক তার অতীতের কোন দুঃসহ কাহিনী হয়তো বলতে চাচ্ছে। কেমন যেন জানতে ইচ্ছে করছে এই মহিলার জীবনকাহিনী। জানি না মনের এ কৌতূহল আদৌ ঠিক কি না। ঠিক হলেই বা কি? সময় বেচারা খুব ডিস্টার্ব করছে। তাই এখন কলেজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে গেলাম।
বেশ কিছুদিন পর বাড়ি থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। বিকেলবেলা আমার বন্ধূটি আর আমি তাদের পুরোনো প্রাইমারি স্কুলের মাঠে গেলাম আড্ডা দিতে। কী সুন্দর স্কুলের মাঠটি! এ যেন বিধাতার নিজ হাতে তৈরি করা সবুজ গালিচা। এ সময় এত সুন্দর মাঠ আর মনোরম পরিবেশের খুব একটা দেখা মেলে না। তাই মাঠের সবুজ ঘাসগুলো আমাকে ডাকছে। আমরা সবুজ ঘাসের উপর বসবো। এর মধ্যে আলাদা একটা মজা আছে। দুই বন্ধু মাঠের মাঝখানটাতে বসবো এই শেষবেলায়। এমন সময় চোখে পড়লো এক অদ্ভুত দৃশ্য! একজন অল্পবয়সী মহিলা, তার উস্কোখুস্কো চুল, পড়নে ছেঁড়া শাড়ি, বিদ্যালয়ের বারান্দায় পড়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। বছরখানেক বয়স হবে এক ছেলে মায়ের নির্লজ্জভাবে বের করে রাখা বাম স্তনটি চুষে খাচ্ছে। যখন সে মুখ সরাচ্ছে তার মুখ থেকে এক ফোঁটা আর এই মহিলার স্তন থেকে এক ফোঁটা দুধ গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। একটু দৃষ্টি দিয়ে দেখতে গিয়ে অবাক হলাম। আরে এই তো সেই মহিলা! যাকে সেদিন দেখেছিলাম আমাদের বড় রাস্তার মোড়ে। অবলীলায় নির্লজ্জ ভঙ্গিমায় বলেছিলো, ‘ভাত খামু, একটা টেহা দেন।’
আজকে সন্ধ্যায় জ্যোৎস্না চড়ুইভাতি খেলতে যেন পৃথিবীতে আগমন করেছে। একা একা বসে আছি এমন সময় হঠাৎ কোন এক পল্লিবালার করুণ মুখখানি চোখের সামনে ভেসে উঠল। কী এক মায়াবী মুখ! কী যেন আছে তার সে মুখের ছায়ায়। তার গায়ের চামড়ার উপর যেন এক ইঞ্চি ময়লার স্তর জমেছে। সেটা বেশি দিনের নয় বুঝা যায়। এ দেহের উপরে দামি সুগন্ধি সাবানের ঘষাঘষি চলতো। মাথায় আজকের যে এলোমেলো জটলা চুল সেখানেও টইটুম্বুর হয়ে থাকতো দামি নারিকেল তেল। এখানে দামি শ্যাম্পু ব্যবহার করা হতো। তার চুল যে ডেলার চুলের চেয়ে কম নয় তা একটু দৃষ্টি দিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। এ চুলের প্রেমে মগ্ন যে কেউ থাকতো বা প্রেমের পরশে বিলি কাটতো তা স্পষ্ট বোঝা যায়। তার শরীর জড়িয়ে আজকে যে শীর্ণ কাপড়; এখানেও শোভা পেতো দামি শাড়ি। তার মুখের যে হাসি তা চাঁদের আলোকেও হার মানায়। কল্পনায় ভেসে আসে তার সে অতীত জীবন। পল্লিবালা এ রমণীর জীবনের অ্যাডভেঞ্চারের যেন শেষ নেই। মনের এ ভাবনাগুলো সত্যি হলো যখন বন্ধুটির কাছে শুনলাম আলেয়ার জীবনের করুণ ইতিহাস। এই অল্পবয়সী মহিলার নাম আলেয়া। আমার বন্ধুর পাশের গ্রামেই আলেয়ার গ্রাম। গতকাল সন্ধ্যায় নিবিষ্ট চিত্তে হাজার তারার মাঝে আমি যে তারাটিকে বারবার দেখছিলাম; সে তারাটিই আলেয়া। গ্রামের এক সরলবধু সে। বিধাতার রোষানল তাকে আজ সর্বস্বান্ত করেছে। সে আজ ঘরহারা, সমাজহারা, প্রেমহারা জনমদুঃখী পাগল। আজ তার কিছুই নেই। স্বপ্ন নেই, আশা নেই, কিছুই নেই...।
একদিন সবই ছিল আলেয়ার। স্বামীর আদর, সংসারের স্বপ্ন, সন্তানদের মানুষ করার চিন্তা সবই। সুখী এক সংসার ছিলো তার। গরীবঘরে জন্ম নিয়ে বড় হতে থাকে আলেয়া। হঠাৎ কী এক রোগে ঝেঁকে ধরে আলেয়ার মধ্যবয়সী মাকে। তাই অল্প বয়সে আলেয়াকে দেখতে হয় মায়ের মৃত্যু। পরপারে পাড়ি জমানোর আগে মা আলেয়াকে দোয়া করে গেলেন। বাবা অবশ্য মায়ের অভাব বুঝতে দেননি কোনদিনও। ভালোঘর দেখে বিয়ে দিলেন। ছেলে ইসহাক খুব ভালো মানুষ। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। ইসহাকের একটি বোন আছে আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। তাই সুখের সংসার। সংসারে তাদের বোঝাপড়া খুব। দুজন দুজনের প্রতি খুব সহনশীল। ভালোবাসার কমতি নেই। অনেকে আলেয়া আর ইসহাকের সংসার, চলাফেরা দেখে ঈর্ষা করে। কোনো অভাব নেই সংসারে। বড়ই সুখী ওরা। জনমদুঃখী মা-মরা মেয়েটার সুখ দেখে বাবাও খুব খুশি। তাই ঘনঘন মেয়ের খোঁজ খবর নেয় বাবা। আলেয়াও সংসার ছাড়া কিছু বোঝে না। এই সংসার ঘিরেই তার সকল কর্মযজ্ঞ। এরই মধ্যে সংসারে যোগ হল দুজন নতুন অতিথি। একটি ছেলে একটি মেয়ে। মেয়েটি বড় আর ছেলেটি ছোট। সুখেই কাটছিল আলেয়ার জীবন। সংসারও যেন সুখের স্বর্গ।
কপালে সবার বোধহয় সুখ সয় না। আলেয়ার সুখগুলোও বেশিদিন স্থায়ী হলো না। কী এক দুরারোগ্য ব্যাধি ধরলো প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। কত ডাক্তার আর কত কিছু, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। অবশেষে স্বামী বেচারাকে আর বাঁচানো গেলো না। সংসারে নেমে এলো মহাবিপর্যয়। একমাত্র রোজগারের মানুষটি গত হয়েছেন। সঞ্চয় করা টাকা পয়সাগুলো শেষ হয়ে গেছে। শেষ সম্বল বিক্রি করেও স্বামীকে বাঁচানো গেল না। বাকি রইলো শুধু এক টুকরো ভিটেবাড়ি। এই অবুঝ দুটি মুখকে বাঁচাতে হবে। আটার সুজি আর আতপ চালের জাউ আর কতদিন! কতদিনই বা প্রতিবেশীদের করুণার পাত্র হয়ে থাকা। তাই সংসারের হাল নিজের হাতে তুলে নিল আলেয়া। তার জীবনযুদ্ধ আর পরিশ্রমে যেন ফুটে উঠল সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি। হাঁস, মুরগি আর ছাগল পালন করা, বাড়ির আঙিনায় লাউ আর সবজি চাষ করে চলতে লাগলো তার সংসার। দুটি সন্তানকে ঘিরেই শুরু হলো আলেয়ার নতুন জীবন। মেয়েটার বয়স পাঁচ বছর আর ছেলেটার মাত্র ছয় মাস।
বিধাতা যদি বাম সাধে জীবনের ইতি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। আলেয়া কোনোদিনই ভাবেনি তার ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে আরেক বিপর্যয়। তার স্বপ্নে বিপর্যয় এই শেষ নয়। আদরের মেয়েটিকে খাওয়ানো শেষে খেলতে যাওয়ার কথা বলে পাশের লাউয়ের মাচায় কাজ করতে গেলো আলেয়া। কিছুসময় পরেই খবর এলো মেয়েটি পাশের ডোবায় খেলতে গিয়ে ফিরেছে লাশ হয়ে। আলেয়া নির্বাক হয়ে গেল। মা, স্বামীর শোক সহ্য করতে পারলেও মেয়ের শোক আর সহ্য হলো না আলেয়ার। জীবনে শুধু আঁধারের হাতছানি। জীবনের এ ধাক্কা আর যেন সহ্য হয় না। তারপর কী যে হলো, আলেয়ার শরীরে যেন বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। প্রতিবেশীরা শুধু করুণার দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। আর মনের গভীর থেকে অস্ফুট ভাষায় বলতে লাগলো ‘আহারে’। তারপর কী যে হলো কেউ বলতে পারে না। শুধু মূল্যহীন প্রলাপ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিধাতাকে দোষারোপ করাই যেন আলেয়ার একমাত্র কাজ। স্বপ্নগুলোর কথা মনে নেই। পৃথিবীর কোন ভাবনাই যেন নেই তার ভেতর। তার ভবিষ্যতের কোন চিন্তা নেই। শুরু হলো তার এ অদৃষ্ট যাত্রা। কোনো খেয়াল নেই এ চলমান পৃথিবীর দিকে। আলেয়ার কথার ঠিক নেই, চলাফেরার ঠিক নেই, খাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমানোর ঠিক নেই। ছয়মাস বয়সী ছেলেটিকে নিয়ে কখনো রাস্তায়, কখনো বাজারে আর বেশিরভাগ সময় রাতকাটে এই প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায়। সংসার-বিমুখ হয়ে গেল আলেয়া। পেটে ক্ষুধা পেলেই লজ্জার মাথা খেয়ে সেই একই বাক্য, ‘ভাত খামু, একটা টেহা দেন।’

প্রিয় পাঠক,
ফেসবুক লগইনের মাধ্যমে এখানে আপনার মতামত জানাতে পারেন। এছাড়া খানিকটা নিচে জিমেইল লগইন করে, নাম বা ইউআরএল লিখে অথবা নামহীনভাবে মতামত জানাবার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধন্যবাদান্তে,
সম্পাদক, ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ