মুজিব হাসানের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘শামাদান’ (২য় পর্ব)

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতবর্ষে ইংরেজদের আগমন, দিল্লিকেন্দ্রিক নানা উত্তেজনা, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, মুসলিমদের সঙ্গে শিখদের বিরোধ, বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত এবং দুর্ধর্ষ সব ঘটনাপ্রবাহকে উপজীব্য করে রচিত রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘শামাদান’। ইতোপূর্বে এটি প্রকাশিত হয় ‘ফাতেহ’ ম্যাগাজিনের ঈদসংখ্যায়। পরবর্তী সময়ে পরিমার্জন-পরিবর্ধন করে লেখক উপন্যাসটিকে নতুন আঙ্গিকে রূপায়ন করেন। ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)-এর পাঠকদের জন্য আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘শামাদান’ এর নতুন সংস্করণ। আজ পড়ুন তার দ্বিতীয় পর্ব। - সম্পাদক
[১ম পর্ব প্রকাশের পর থেকে]


    মাদরাসায়ে রহিমিয়া।

    আধো আলো আধো ছায়ার চাঁদোয়ার নিচে বসে আছে একটি জামাত। একজন দুজন করে লোক এসে এর পরিধি বাড়িয়ে তুলছে। কুরআনিক মজমার আয়োজনে চারদিকে বিরাজ করছে পবিত্র আবহ। এর পরশ সবাইকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার আসরের পর মাদরাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তাফসির মজলিস। আলেম-উলামা, পির-মাশায়েখ, ধর্মপ্রাণ জনসাধারণ ও কবি-সাহিত্যিকগণ হৃদয়ের তাকাজা নিয়ে উপস্থিত হন এ মজলিসে।     মজলিসের মধ্যমণি যিনি, সর্বসাধারণ তাকে ডাকে শাহ সাহেব আর জ্ঞানীমহল তাকে অভিহিত করেন সিরাজুল হিন্দ ও হুজ্জাতুল্লাহ বলে। তার তাফসির বিপন্ন জনতার মনে জাগিয়ে তোলে আশার প্রদীপ। প্রশান্তিতে ভরে ওঠে হতোদ্যম হৃদয়।

    ততক্ষণে মজলিস কায়েম করে সবাই বসে গেছে। বাহরাম চাচাকে সঙ্গে নিয়ে ইমাম বখশ উপস্থিত হলেন। পুরোটা পথ হেঁটে আসায় দুজনের ভেতর থেকে ক্লান্তির নিঃশ্বাস পড়ছিল। কিন্তু মজলিসে বসার সঙ্গে সঙ্গে মনমেজাজ হয়ে গেল ফুরফুরে। বাহরাম চাচা নতমুখে বসে আছেন। ইমাম বখশ মুগ্ধ চোখে দেখছেন চারদিক। বিকেলের ঝলমলে আলোয় তার সামনে ভেসে উঠছে মাদরাসায়ে রহিমিয়ার ঐতিহ্যিক দৃশ্যপট।     সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়কালে প্রখ্যাত আলেম শাহ আবদুর রহিম প্রতিষ্ঠা করেন এ মাদরাসা। তিনি ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিখ্যাতগ্রন্থ ফাতওয়ায়ে আলমগিরির সংকলকদের একজন। মোগল রাজদরবারে তার কদর ছিল অনেক। তারই গুণধর পুত্র শাহ ওয়ালিউল্লাহ এ মাদরাসার দায়িত্ব গ্রহণ করে একে করে তোলেন ভারতবর্ষের ইসলামি জ্ঞানের আঁতুড়ঘর। কুরআনের আলো, হাদিসের সৌরভ, বিশুদ্ধ ধর্মবিশ্বাস ও অমিয় মূল্যবোধের চিন্তাধারাকে ছড়িয়ে দেন ইরান-তুরান, আরব-আজমের সবখানে।     নিজেকে তিনি গড়ে তোলেন একজন যুগস্রষ্টা ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে। মোগল সাম্রাজ্য মুখ থুবড়ে পড়ার মুহূর্তে তিনি আবির্ভূত হন পুনরুদ্ধারকারীর ভূমিকায়। তার সমাজ সংস্কারের চিন্তাধারা, কর্মপদ্ধতি, জ্ঞানসাধনা ও শাস্ত্রীয় উদ্ভাবন তাকে চির অমর করে রাখবে। পৃথিবীবাসী তাকে মনে রাখবে

মুহাদ্দিসে দেহলবি হিসেবে।     বর্তমানে এ মাদরাসার দায়িত্বে আছেন তার সুযোগ্য পুত্র শাহ আবদুল আজিজ। পিতার চিন্তাধারাকে তিনি বিস্তৃত করে চলছেন, বাস্তবায়ন করছেন তার স্বপ্নগুলোকে। তারই অনুকরণে চালিয়ে যাচ্ছেন এ তাফসির মজলিস। আজকের পর থেকে পৃথিবীবাসী তাকে মনে রাখবে এক ঐতিহাসিক ফতোয়ার বিপ্লবী ঘোষক হিসেবে।     ধীর অথচ দৃপ্ত পায়ে দীর্ঘদেহী, ক্ষীণকায়, প্রশস্ত চোখের অধিকারী একজন ব্যক্তিকে এগিয়ে আসতে দেখে উপস্থিত লোকজনের অপেক্ষায় পূর্ণচ্ছেদ পড়ল। দীপ্ত মনে আগ্রহান্বিত হয়ে বসে রইল সবাই। সাধারণ লোকজনের চোখেমুখে খেলে গেল আশার দ্যুতি। উলামা-মাশায়েখের মুখগুলো দীপিত হয়ে উঠল। সালাম-মারহাবার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো মজলিস।     শাহ আবদুল আজিজ মধ্যমণি হয়ে আসন গ্রহণ করলেন। তার পাশে বসলেন শাহ ইসহাক, তার আদরের দৌহিত্র; যাকে তিনি মাদরাসায়ে রহিমিয়ার দায়িত্ব দিয়ে নিজের স্থলাভিষিক্ত করবেন এবং দিয়ে যাবেন তার জ্ঞান ও সম্পদের সমুদয় পাথেয়। তার পাশে শাহ ইয়াকুব, যিনি নানা ও বড় ভাইয়ের এ কর্মধারাকে চালু রাখবেন।     একটু দূরত্বে বসলেন তার দুই ভাই শাহ রফিউদ্দিন ও শাহ আবদুল কাদির, যারা এ শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনায় তার প্রধান সহকারী এবং তাদের ওপর অর্পিত তার লেখালেখি ও ওয়ালিউল্লাহি চিন্তাধারা প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব।     তাদের পাশে আবদুল হাই, তার জামাতা,যাকে তিনি উপাধি দেবেন শায়খুল ইসলাম। অপর পাশে শাহ ইসমাইল, তার ভাতিজা, যাকে তিনি উপাধি দেবেন হুজ্জাতুল ইসলাম। এই দুজনেই এগিয়ে নিয়ে যাবেন তার ওয়ালিউল্লাহি চিন্তাধারার জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মিশন, যার নেতৃত্বে থাকবেন তারই হাতেগড়া শিষ্য

সাইয়িদ আহমদ। বালাকোটের ময়দানে শাহাদাতের পেয়ালা হাতে যিনি উড্ডীন করবেন স্বাধীনতার পতাকা। মহাকালের অমর বাতিওয়ালা হয়ে উম্মাহর সামনে রেখে যাবেন জাগরণের শামাদান।     উপস্থিত আছেন দিল্লির প্রসিদ্ধ আলেম ও কুতুব, মির্জা মাজহার জানে জানার প্রধান খলিফা শাহ গোলাম আলি, যিনি তার কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন বুখারি শরিফের সনদ এবং আরও অনেক প্রসিদ্ধ উলামা-মাশায়েখ। এ নক্ষত্রদের আলোয় জ্বলজ্বলে দেখাচ্ছে বাহরাম চাচা ও ইমাম বখশকে।     কুশল বিনিময়ের পর শুরু হলো তাফসির মজলিস। শাহ ইসহাক কুরআনুল কারিম থেকে তেলাওয়াত করলেন সুরা নিসার পঁচাত্তর নম্বর আয়াতটি

“ওয়ামা লাকুম লা তুকাতিলুনা ফি সাবিলিল্লাহ…

    তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছ না সেসব অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্য—যারা বলছে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এই অত্যাচারী অধ্যুষিত জনপদ থেকে বের করুন! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য নিযুক্ত করুন একজন অভিভাবক; আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য নিযুক্ত করুন একজন সাহায্যকারী!”     শাহ ইসহাক তেলাওয়াত শেষ করলেন। উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে মুফাসসিরে দেহলবি শাহ আবদুল আজিজ শুরু করলেন বয়ান

    ‘মুহতারাম হাজিরিন, এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে আমাদের এ কথাগুলো স্মরণ রাখতে হবে, এক সঙ্গিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা দিনাতিপাত করছি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা সকলের চোখের সামনে রয়েছে। এ শহরকে কেন্দ্র করে অনেক বিপর্যয় আমরা দেখেছি। প্রকৃত শাসন যাদের হাতে থাকার কথা, তারা আজ বিমুখ। এ সুযোগে ভিনদেশী শক্তি এসে দখল করে নিয়েছে ক্ষমতা।     বর্তমান যে সময়টা আমরা পার করছি, অবস্থা দেখে প্রতীয়মান হচ্ছেএ সময়টা আমাদের প্রজন্ম,

ইসলামি নেতৃত্ব-শাসন এবং এ দেশে মুসলমানের ভবিষ্যতের জন্য খুবই বিপজ্জনক।’

এটুকু বলে তিনি একটু থামলেন। উপস্থিত কবিত্বের স্ফুরণে গেয়ে উঠলেন এ পঙক্তিটি—

ফিরিঙ্গিদের দেখেছি আমি অনেক ক্ষমতাময়

তারা দিল্লি ও কাবুলের মাঝে করছে বিপর্যয়!

    উপস্থিত লোকজন সমঝদারের মতো মাথা নাড়লেন। শাহ আবদুল আজিজ পরবর্তী আলোচনা টানার আগে আবারও একটু থামলেন। শারীরিকভাবে তিনি কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করছেন। এ বয়সে এসে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। কিন্তু তিনি এসবকে কমই আমলে নিচ্ছেন। জাতির ঘোর দুর্দিনে তাদের উত্তোরণের প্রচেষ্টায় যিনি সবাইকে উজ্জীবিত করে চলছেন, শারীরিক অসুস্থতা তাকে এত সহজে কাবু করতে পারবে না।
    খানিকটা বিরতি নিয়ে শাহ আবদুল আজিজ ফুসফুস ভরে প্রাণশক্তি নিলেন। প্রাণবন্ত কণ্ঠে শুরু করলেন বয়ান—

    ‘মুহতারাম হাজিরিন, আমরা দেখছি ব্রিটিশ বেনিয়ারা ক্ষমতা দখল করে এরিমধ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রকাশ শুরু করে দিয়েছে। উপমহাদেশজুড়ে তারা জারি করেছে এ ফরমান— সৃষ্টি আল্লাহর, সাম্রাজ্য সম্রাটের আর কর্তৃত্ব কোম্পানি বাহাদুরের। ভারতবর্ষে ইসলামি শক্তির নিরাপত্তা এবং মুসলমানের স্বাধীনতার পথে এটা আমাদের সামনে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।’

    শাহ আবদুল আজিজ আবারও দম নিলেন। তিনি আজ যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন এবং যে প্রশ্নটি সবার সামনে আনতে চাচ্ছেন, সেই ব্যাপারে উপস্থিত লোকদের আগ্রহ, উপলব্ধি ও মনোভাব কেমন— সবার দিকে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এটা বোঝার চেষ্টা করলেন।

    কিছু সময় নীরবতায় অতিবাহিত হওয়ার পর তার জামাতা আবদুল হাই তার মনের সেই আন্দাজটির উচ্চারণ করলেন, ‘হজরত, বর্তমানে আমরা যে প্রেক্ষাপটে আছি, অবস্থার বিবেচনায় সবার মনে এ প্রশ্নটি আসছে—ভারতবর্ষ কি এখন দারুল ইসলাম আছে, না দারুল হরব হয়ে গেছে?’

    প্রশ্ন শুনে সবাই নড়েচড়ে বসলেন। শাহ আবদুল আজিজ দীপিত মুখে তাকালেন আবদুল হাইয়ের দিকে। এ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে তিনিও হবেন তার ফতোয়ার ঘোষক ও প্রচারক। ইসলামি বিধান ও বাস্তবতার আলোকে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মিশেলে শাহ আবদুল আজিজ বলতে শুরু করলেন—

    ‘আমরা যদি ফিকহি দৃষ্টিকোণে এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করি, তাহলে দেখতে পাব—দারুল ইসলাম দারুল হরব হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত জরুরি:

    এক. সেই দেশে কাফেরদের বিধান জারি হওয়া, কোনো ইসলামি বিধান কার্যকর না হওয়া। দুই. দারুল হরবের সঙ্গে দেশের সীমানা এক হয়ে যাওয়া, দুই. দেশের মাঝখানে কোনো দারুল ইসলাম না থাকা। তিন. দারুল ইসলামে মুসলমান ও জিম্মিদের যেসব নিরাপত্তা-অধিকার ছিল, তা অকার্যকর হয়ে যাওয়া।

    এ তিন শর্তের ব্যাপারে হানাফি মাজহাবের ইমামগণ একমত। তবে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর নিকট এ তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে তিন অবস্থার প্রেক্ষিতে:

এক. কাফেরদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। দুই. দেশের নাগরিকগণ মুরতাদ হয়ে যাওয়া এবং সবখানে কাফেরদের বিধান জারি হয়ে যাওয়া। তিন. জিম্মিরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং সংখ্যায় বেড়ে যাওয়া।

    আর ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর নিকট এ তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে এক অবস্থার প্রেক্ষিতে : তা হলো, সবখানে কাফেরদের বিধান জারি হয়ে যাওয়া। এটাই বাস্তবতা নিরীক্ষিত ফলাফল।’


    ইসলামি বিধান উল্লেখ করার পর এবার তিনি তুলে ধরলেন ঘটমান বাস্তবতাকে—

    এই শহরে (দিল্লিতে) মুসলমান শাসকের কোনো কর্তৃত্ব নেই। খ্রিষ্টান শাসকদের নির্দেশই এখানে নিরঙ্কুশভাবে কার্যকরী। শরিয়তে বর্ণিত দারুল হরব তথা অমুসলিম কর্তৃত্ব ও নির্দেশ প্রয়োগের অর্থ হচ্ছে—রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রজাসাধারণের বন্দোবস্ত, ট্যাক্স-কর, ব্যবসার সম্পদের এক-দশমাংস উসুল করা, চোর-ডাকাতদের শাস্তি বিধান, বিচারকার্য ও অপরাধ দমনে ব্রিটিশ কোম্পানিই সর্বোচ্চ শাসক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

    যদিও তারা মুসলমানের ইসলামি বিধান প্রতিপালন যেমন: জুমা ও ইদের নামাজ, আজান ও গরু কুরবানি ইত্যাদি বিষয়গুলোতে কোনো ধরনের বাধা দিচ্ছে না, তারপরও এ বিষয়গুলো তাদের দয়া ও করুণা ওপরই হচ্ছে। ইচ্ছা ও মতামতের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার লাভের বিষয়টি অর্থহীন ও পদদলিত অবস্থায় পড়ে আছে।     এ কারণে আমরা দেখছি, তারা কোনোরকম ভ্রুক্ষেপ না করে মসজিদগুলোকে ধসিয়ে দিচ্ছে। সর্বসাধারণকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কোনো মুসলমান বা জিম্মি তাদের অনুমতি ছাড়া এ শহরে বা এর উপকণ্ঠে প্রবেশ করতে পারছে না। নিজেদের স্বার্থে তারা বহিরাগত মুসাফির ও বণিকদের নিষিদ্ধ করছে না। কিন্তু দেশের পদমর্যাদার অধিকারী লোক যেমন : শুজাউল মুলক, বেলায়েতি বেগম প্রমুখ তাদের অনুমতি ছাড়া শহরে প্রবেশ করতে পারছে না।     এই দিল্লি শহর থেকে কলকাতা পর্যন্ত খ্রিষ্টানদের শাসনকর্তৃত্ব বিস্তৃত। তবে ডান-বামের কিছু এলাকা যেমন : হায়দারাবাদ, লখনৌ ও রামপুরে তাদের কর্তৃত্ব জারি করেনি। কোথাও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার কারণে আর কোথাও সেসব রাজ্যের শাসকগণ তাদের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার কারণে। এ সমস্ত কারণে গোটা দেশ দারুল হরব হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।’

    ধর্মীয় আলোকে এ ব্যাখ্যা করে শাহ আবদুল আজিজ একটু থামলেন। এবার তিনি হৃদয়ের আকুলতা মিশিয়ে উদ্দীপ্ত কণ্ঠে মূল নিবেদনটির জানান দিলেন—

    ‘মুহতারাম হাজিরিন, ভারতবর্ষে এখনো পর্যন্ত যে বিপুল মুসলিম শক্তি বিদ্যমান, তাদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। হয় শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, নয়তো কোনো ইসলামি দেশে হিজরত করে চলে যাওয়া। দারুল হরবে অবস্থানরত প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি এটা মাজহাবি কর্তব্য—ফরজ।

    আর যদি ইসলামি হুকুমত অনৈসলামিক শক্তির মুকাবিলা করতে সমর্থ না হয়, তাহলে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠিত রাখার দায়িত্ব সর্বসাধারণ মুসলমানের ওপর বর্তায়। মুসলিমসমাজ এ বিষয়ে উদাসীন থাকতে পারে না। শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ঔদাসীন্য হবে অবৈধ—হারাম। ইসলামি হুকুমত এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে প্রত্যেক মুসলমানকে শত্রুর মুকাবিলা করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে প্রস্তুত থাকতে হবে; গড়ে তুলতে হবে সম্মিলিত শক্তি।
    যেহেতু বিধান নির্ধারণের সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খ্রিষ্টানদের হাতে আবদ্ধ হয়ে আছে, ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্ট হয়ে চলছে এবং গণমানুষের স্বাধীনতার ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সেহেতু এখন দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের জন্য অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, এই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে খোলাখুলি জিহাদ ঘোষণা করা।’

    শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে শাহ আবদুল আজিজের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত হয়ে উঠল। এর আবেদন উচ্ছ্বসিত করে তুলল উলামা-মাশায়েখ ও সর্বসাধারণ সকলকে। তার কথায় উদ্দীপিত হয়ে উপস্থিত সবাই উদ্দীপ্ত কণ্ঠে তাকবির দিয়ে উঠলেন—

‘আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!’

    সমস্ত দিনের উজ্জ্বলতা শুষে সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তে অস্তমিত হচ্ছে। ডালিমের দানার মতো গুঁড়ো গুঁড়ো আবির ছড়িয়ে পড়ছে অস্তাচলের চারদিকে। আবছা কাজলরেখা গাঢ় করে ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। ভিনদেশী শত্রুকবলিত দিল্লিতে চলছে রাত্রির আয়োজন।

    এ রাত ধুরন্ধর শত্রুদের কূটচালের ভেতরে ঘনঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে। আলিফ লায়লার দীর্ঘতা নিয়ে বাড়তেই থাকবে কেবল। স্বাধীন ভোরের ঝলমলে রোদ্দুর থাকবে অনেক দূরে। মুক্তিকামী ভারতবাসী উন্মুখ হয়ে প্রত্যাশা করবে একজন অমর বাতিওয়ালার আগমন।

    নিশুতির অন্ধকার বিদীর্ণ করে তিনি আবির্ভূত হবেন, উম্মাহর সামনে রেখে যাবেন জাগরণের শামাদান; যার মধ্যে থরে থরে প্রজ্জ্বলিত হবে একের পর এক স্বাধীনতার দেদীপ্যমান প্রদীপ।


[চলবে...]


প্রিয় পাঠক,
ফেসবুক লগইনের মাধ্যমে এখানে আপনার মতামত জানাতে পারেন। এছাড়া খানিকটা নিচে জিমেইল লগইন করে, নাম বা ইউআরএল লিখে অথবা নামহীনভাবে মতামত জানাবার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধন্যবাদান্তে,
সম্পাদক, ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ