জীবন তাপস তন্ময়
‘বাজান, নিয়ত করছি ঢাহা যাইমুগা। টেহা কামাইমু। দেদারছে।’ আমি তাকাই। দেখি মতি চাচার চোখে স্বপ্ন। মতি মিয়া। রিকশা চালায়। সত্তর ছুঁই-ছুঁই। দেখে মনে হলো। এখনও তিনি গতর খাটেন। রিকশা চালান। গতি মন্থর নয়। বেশ জোরেসোরেই চালান রিকশা। সজোরেই প্যাডেলে পা পড়ে। এতো দ্রুত চালাতে কম চালককেই দেখেছি।
ফিনফিনে গড়ন। চিকনকায়। বাতাসে পড়ে যাবেন। মনে হতে পারে। গায়ে হালকা ফতুয়া। মাথায় টুপি। থুতনির দিককার এক মুঠো দাড়ি। মুঠো বলা যায় না। সামান্য দাড়ি। অনেকে ঠাট্টা করে ছাগল-দাড়িই বলে।
শহরের কালিবাড়ি মোড় থেকে বাসায় যাব। রাত একটা ছুঁই-ছুঁই। অটো খুঁজছি। একটাও নেই। রিকশাও দেখছি না। পুলিশের একটা টহল গাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। অনেকখানি সময় অপেক্ষা করে হাঁটতে শুরু করি। কাচারি বাজার যেতেই একটা রিকশা পেছন দিক থেকে আসছে। সজোরেই। আমাকে দেখেই থামায়।
: বাজান, কই যাইবেন?
- শিক্ষকপল্লী।
: উঠেন।
- ভাড়া?
: দিয়েন।
- কতো, বলেন?
: যা পারেন, দিয়েন। সবসময়ই যান, কওন লাগতো না।
আমি সাধারণত রিকশায় দামদর করি না। কী আর নেবে? গতর খাটুনি থেকে। এই প্রথম দাম করলাম। কেন জানি না।
‘আমি মতি মিয়া। লতিবপুর তাহি। আরেকজনের বাড়িত। এক পোলা দুই মাইয়া। মাইয়া দুইডার বিয়া দিসি। ভালাই আছে। জামাইর বাড়ি। পোলাডাও বিয়া করছে। পোলাডারে লেহাপড়া করাইছি। উপযুক্ত অইছে। ভালাই কামায়। আমারে দেয় না। বউডা ভালা না। বউ যেমনে কয়, এমনেই চলে। সাদাসিদা আছিন পুতটা। বিয়ার পর কেমুন যেন অয়া গেছে। টেহাপয়সা দেয় না। মাইয়া দুইডা টেহা দেয়। জামাই বাবাজিরা যে হাত খরচের টেহা দেয়, হেইতা থাইক্কাই আমারে কিছু দেয়। যা পারে। কইনচাইন হুনি, মাইয়ারার টেহায় আমি চলমু? কিতা কইন বাজান, এইডা অয়? ইট্টু জাগা আছিন, ঘরও আছিন, পোলায় বেইচ্যা বেক টেহা নিছেগা। কয় ঢাহা তাকব। গেরামে না। আমরারেও নিবো। দুয়েকদিন আছিলাম। বউডা খালি জ্বালায়। বেক কাম আফনের চাচিরে দিয়া করায়। কিছতা করে না। টেঙ্গের উফরে টেঙ তুইল্লা বইয়া তাহে। রাগে একদিন আয়া পড়ছি। একজনে দয়া কইরা বাড়িত জাগা দিছে। মাইয়ারার টেহায় রিকশাডা কিনছি। এইডা চালাইয়াই খাই। কিতা কইতাম বাজান যুগডাই জানি কেমুন অয়া গেছে গা। বাজান হুনচুইন?’
মুখে রা নেই। কী আর বলবো? মতি চাচার জীবনের গল্প। সমাজের দর্পণ। কিছুই বলিনি, নিজের থেকেই বলছে। আমি জিজ্ঞেসও করিনি। তবে ভেতরে এই জিজ্ঞাস্য ছিল। প্রশ্ন ছিল। এই বয়সে একটা লোক রিকশা চালায়? শরীরে কিছু নেই। মনোবল একটুও কমেনি। স্ত্রীর সম্মানে আত্মসম্মানে নিজে কাজ করছেন। কারও কাছে হাত না পেতে।
জি, বলেন। আমি শুনছি। তাহলে ঢাকা কেন যাবেন? কী করবেন? ছেলের বাসায় উঠবেন?
‘আরে নাহ! এইতা কিতা কইন বাজান? ছেড়া নাই। থাইক্যাও নাই। আফনের চাচিরে থুইয়া আমি ঢাহা যাইমুগা। এই রিশকাডা লইয়া। সারারাইত রিশকা চালাইমু। দিনে গাড়ি-ঘোড়া বেশি থাহে রাস্তায়। আমার অসুবিধা অয়। রাইতে ঝামেলা নাই। আরাম কইরা চালাইতাম ফারমু। রিশকা চালাইয়া বেক টেহা মজিদের ইমামের টাইন থুইয়া দিমু। ইশটিশনো ঘুমাইমো। কোনু গাছের তলে। রিশকা লইয়া। কী কইন বাজান? কামডা টিহইবো না?’
অবাক হই। মতি চাচার মনের জোর দেখে। এই বয়সে সে কাজ করছে। ভিক্ষা না করে। হাত না পেতে। বললাম, আপনি এই বয়সে ঢাকা কেন যাবেন? এখানে যে টাকা কামান, তাতে যদি আপনার চলে, আমি বলবো ঢাকা যাবেন না। আপনার বয়স হইছে। এই বয়সে এমন সিদ্ধান্ত না নেয়াই উচিত।
মতি চাচা কথা বলে না। চুপ থাকে। এরই মাঝে বাসায় চলে আসি। নির্ধারিত ভাড়া থেকে দ্বিগুণ দিই। তিনি অর্ধেক টাকা ফেরত দেন। বললাম, এখন রাত। ভাড়া একটু না হয় বেশিই নিলেন।
‘না বাজান। আমারে বিশ টেহা দিলেই অইবো। বেশি লাগব না।’ জোর করেও তাকে বেশি দিতে পারিনি।
রাত সাড়ে বারোটা। কাচারি বাজারের দোকানপাট সব বন্ধ। একটা পুলিশের গাড়ি হুইসেল দিয়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। রাস্তায় আর কোন গাড়ি চোখে পড়েনি। অটো রিকশা কিছুই দেখছি না। হুইসেল কেন বাজালো বুঝিনি! কোথাও কোন মিশন চলছে। আসামি ধরতে যায়। আমি মোড়টায় দাঁড়িয়ে। একটা অ্যাম্বুলেন্স চলে যাচ্ছে। গা ঘেঁষে। হুইসেল দিয়ে। সদর হাসপাতালে যাবে হয়তো। আমি বাসায় যাব। অপেক্ষা করছি রিকশা অথবা অটোর জন্য। কোত্থেকে যেন একটা রিকশা এলো।
‘বাজান আফনে? কতো খুঁজছি। আফনে যে বাসাডাত তাকতাইন, ঐহানোও গেছিলাম। এক বেডি কইলো অহন আর থাহেন না ঐ বাসাত। ঢাহা নাহি গেছুইন গা। বাজান, কুম্বালা আইছুইন ঢাহা থাইক্যা? উডেন রিশকায়। আমি হা করে তাকিয়ে আছি। আমি ঠিক চিনতে পারছি না। আবার চেনা চেনাও লাগছে। তাকাই। সাদা গোল গলার একটা গেঞ্জি। মাথায় গোল টুপি। পড়নে সাদা চেকমতো লুঙ্গি। থুতনিতে একমুঠো দাড়ি। লালরঙা। মেহেদিরঙা লাল। সাদা ধবধবে চুল। কাঁধের দিকে ঝুলে আছে।
‘আমারে চিনতাইন পারতাছুইন্না বাজান? ভুইল্যা গেছুইন? আমি কিন্তুক ভুলিনাই আফনেরে। মনে কইরা দেহুইন। একবার আমার রিশকাত উঠছিলাইন। রাইতের এই টাইমেই। বেশিদিন না বাজান। বছর দুয়েক অইবো। আফনে আমারে একটা বুদ্ধি দিছিলাইন৷ আমি ঢাহা যাইতাম চাইছলাম। রিশকা বাওনের লাইগ্যা…’
আমার তখনই মনে পড়লো। তাইতো বলি চেনা চানা লাগছে কেন? জি। আমি এখন ঢাকা থাকি৷ আমার মা ও ছোটভাই এখানেই থাকে। শিক্ষকপল্লীতেই। অন্য একটা বাসায়। ভাড়া নিয়েছি। আমি মাসে দু’তিনবার আসি। ঢাকায় জব করি। এবার সবাইকে নিয়ে যেতে এলাম কিশোরগঞ্জে। ‘বাজান রিশকায় উডেন। এইডাই বালা। একসাথে বেহে মিল্লা থাকবাইন। এইডার চে’ শান্তি আর নাই বাজান।’
আমি রিকশায় উঠি। যেতে যেতে মতি মিয়া বলেন, ‘বাজান জানুইন কিতা অইছে? আমার যে পুত আমারে আফনের চাচিরে থুইয়া বউ লইয়া ঢাহা গেছিনগা। হেই ফুতরে থুইয়া বউ আরেকটা বিয়া করছে। তালাক দিয়ালছে আমার ফুতরে। সয়সম্পদ আর টেহাফইসা যা কামাইছিন আমার ফুতে, বেকতা রাইখ্যা দিছে। অহন আরেগ জামাইর গর করে। আমার ফুত কানতে কানতে বাড়িত আইছে। অহন আমার লগেই থাহে। বাইচ্যা গেছে কুনু পুলাপাইন অইছিন না। নাইলে যে কী দশাডাই না অইতো, আল্লা’ জানে। যা করে আল্লা’ ভালাই করে। এই ফুত অহন আমার লগে থাহে। একটা দোহান লইয়া দিছি। চা-পান বেচে। ইশটিশনো। আফনেরে লইয়া একদিন যাইমুনে। বাজান হুনছুইন?’
আমি ভাবছি। মানুষের কত বদল হয়। সন্তান পেয়ে মতিচাচা কত খুশি। সেদিন এই সন্তানের জ্বালাতেই ঢাকা যেতে চেয়েছিলেন। সন্তান ঢাকায় থাকে। এক শহরে থাকবে। শুধু এইটুকুনই সান্ত্বনার জন্য। আজ সেই সন্তানই এখন মা-বাবার কাছে। তবুও তিনি কাজ করছেন। গতর খাটেন। কিন্তু এই পরিশ্রম যেন তার গায়েই লাগে না। কত ফুরফুরে আর নির্ভার লাগছে মতিচাচাকে।
জি, বলুন চাচা। আমি শুনছি৷
‘বাজান আফনে আমারে বাঁচাইয়া দিছিলেন হেইদিন। আমি আফনের কথা ভাবছি। বাড়িত গিয়া। আফনে টিহেই কইছিলাইন হেইদিন। এই বয়সে ঢাহা গিয়া কিতা করমু? কই থাকমু? আমার ইহানোই ভালা। আমি আর ঢাহা গেছি না। কিতা কইন বাজান, কামডা ঠিক করছি না?’

0 মন্তব্যসমূহ
প্রিয় সুহৃদ,
এখানে আপনার মতামত জানাতে পারেন।
এখানকার মন্তব্য প্রাথমিক অবস্থায় সার্ভারে অদৃশ্যভাবে জমা থাকবে। অ্যাডমিন প্যানেল থেকে অনুমোদন দেওয়ার পর তা দৃশ্যমান হবে।
ধন্যবাদান্তে,
তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ, ‘ৎ’ (খণ্ড-ত)